"তাইফের মর্মান্তিক ইতিহাস"!
...................................

হে নবী আমিতো আপনাকে বিশ্বজগতের রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি ।
(সূরা আম্বিয়া আয়াত 107)

বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ছিলেন অসীম দয়াময় ও বিশ্ব জগতের রহমতস্বরূপ। যার বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে তায়েফের মর্মান্তিক ঘটনা ।

ইসলামী দাওয়াতের জন্য রেডিমেট অনুকূল পরিবেশ কোনো নবী-রাসূলের বেলায়ই জোটেনি। বরং অনেক নির্যাতন, রক্ত ও শহীদের বিনিময়ে পরিবেশ তৈরি করে নিতে হয়েছে। আমাদের প্রিয়নবী রাহমাতুল্লিল আলামিন রাসূলে আকরাম সা:ও এর বিপরীত নন। নবুয়ত প্রাপ্তির পর মক্কার জমিন তাঁর জন্য কণ্টকাকীর্ণ হয়ে যায়। তাঁর প্রতি তাঁর স্বজাতিদের নির্যাতন, ঘৃণা, অবজ্ঞা ও শাস্তির মাত্রা দিন দিন বাড়াতে থাকে।

বিরোধিতার মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করে। খুব কমসংখ্যকই দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। এমনই পরিস্থিতিতে নবুয়তের দশম বর্ষের শুরুর দিকে ৬১৯ ঈসায়ি সালের মে মাসের শেষ দিকে অথবা জুন মাসের প্রথম দিকে জায়েদ ইবনে হারেসকে সাথে নিয়ে নবী সা: তায়েফ গমন করেন। হেঁটে ৬০ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে তায়েফ পৌঁছেন।

মুহাম্মদ সা: তায়েফ পৌঁছে ছাকিফ গোত্রের তিনজন সর্দারের কাছে যান, তারা ছিল পরস্পর ভাই। নবীজী তাদের কাছে গিয়ে বসলেন, সর্বোত্তম ভাষায় তাদের আল্লাহর পথে দাওয়াত দিলেন। দাওয়াতের বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে আলোচনা করলেন এবং আল্লাহর সত্য দ্বীন কায়েমে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা চাইলেন। কিন্তু তাদের হঠকারি ও তিরস্কারমূলক বাক্যালাপ নবীজীর মনে বিষমাখা তীরের মতো আঘাত করতে লাগল। তিনি চরম ধৈর্যের সাথে কথাগুলো শুনলেন এবং তাদের কাছে অনুরোধ করে বললেন, ‘তোমরা তোমাদের কথাগুলো নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখো এবং এসব কথা বলে সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে দিও না।’ এরপরই তারা তাদের শহরের তরুণ, চাকর-বাকর এবং ক্রীতদাসদের বিশ^নবীর পেছনে লেলিয়ে দিয়ে বলে, ‘এ লোকটাকে আমাদের জনপদ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে এসো।’

বখাটে তরুণদের এক বিরাট দল নবীজীর পা মোবারক লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে মারতে থাকে। পাথরের আঘাতে নবীজী বসে পড়েন, পা কেটে গিয়ে অঝোরে রক্ত বইতে শুরু করল, রক্তে জুতার ভেতর ও বাইরে ভিজে গেল। এ দৃশ্য দেখার জন্য চতুর্দিক থেকে বখাটের দলেরা হাজির হতে লাগল। নবীজী কোনোভাবে প্রাণ রক্ষা করে একটা আঙুর বাগানের কাছে গিয়ে পৌঁছেন। রক্তাক্ত শরীরে নবীজী দুই রাকাত নামাজ পড়ে অত্যন্ত দরদভরা মনে দোয়া করলেন ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আমার দুর্বলতা, অসহায়তা এবং মানুষের কাছে আমার মূল্যহীনতা সম্পর্কে অভিযোগ করছি। দয়ালু দাতা, তুমি দুর্বলের প্রভু, তুমি আমারও প্রভু। তুমি আমাকে কার কাছে ন্যস্ত করেছ? আমাকে কি এমন অচেনা কারো হাতে ন্যস্ত করেছ যাকে তুমি আমার বিষয়ের মালিক করে দিয়েছ? যদি তুমি আমার ওপর অসন্তুষ্ট না হও, তবে আমার কোনো দুঃখ নেই, আফসোসও নেই। তোমার ক্ষমাশীলতা আমার জন্য প্রশস্ত ও প্রসারিত করো। আমি তোমার সত্তার সেই আলোর আশ্রয় চাই, যা দ্বারা অন্ধকার দূর হয়ে আলোয় চারদিক ভরে যায়। দুনিয়া ও আখিরাতের সব বিষয় তোমার হাতে ন্যস্ত। তুমি আমার ওপর অভিশাপ নাজিল করবে বা ধমকাবে যে এ অবস্থায় তোমার সন্তুষ্টি কামনা করি। সব ক্ষমতা ও শক্তি শুধু তোমারই, তোমার শক্তি ছাড়া কারো কোনো শক্তি নেই।’

কিছুক্ষণ অবস্থানের পর নবী সা: বাগান থেকে বেরিয়ে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মক্কার উদ্দেশে রওনা হলেন। ‘মানায়েল’ নামক জায়গায় পৌঁছার পর আল্লাহর নির্দেশে জিবরাইল আ: এলেন তাঁর সাথে পাহাড়ের ফেরেশতারাও ছিলেন। তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে অনুমতি চাইতে এসেছিলেন যে, যদি তিনি বলেন, তবে তায়েফের অধিবাসীদেরকে দু’টি পাহাড়ের মধ্যে পিষে দেবেন।

সহীহ বুখারী তে আয়েশা (রা:)থেকে বর্ণিত রয়েছে, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূলকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওহুদ দিনের চেয়ে মারাত্মক কোনো দিন আপনার জীবনে এসেছিল কি? রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘আমার কাওম থেকে আমি যে বিপদের সম্মুখীন হয়েছি, তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দিন ছিল তায়েফের দিন। আমি আবদে ইয়ালিস ইবনে আবদে কুলালের সন্তানদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলাম; কিন্তু তারা আমার দাওয়াত গ্রহণ করেনি। আমি দুঃখ-কষ্ট ও মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় কারোন ছাআলাবে পৌঁছে স্বস্তির নিঃশ^াস ফেললাম। সেখানে মাথা তুলে দেখি মাথার উপরে এক টুকরো মেঘ। তাকিয়ে দেখি সেখানে জিবরাইল আ:। তিনি আমাকে বললেন, আপনার কাওম আপনাকে যা যা বলেছে আল্লাহ তায়ালা সবই শুনেছেন।

পাহাড়ের ফেরেশতারা আমাকে আওয়াজ দিলেন, সালাম জানালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি চান তবে আমরা ওদেরকে দুই পাহাড়ের মধ্যে পিষে দেবো। নবী সা: বললেন, না! আমি আশা করি আল্লাহ তায়ালা ওদের বংশধরদের মধ্যে এমন মানুষ সৃষ্টি করবেন যারা শুধু আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।’ (সহিহ বুখারি) রাসূল সা:-এর এ জবাবে তাঁর দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা, অনুপম ব্যক্তিত্ব ও উত্তম মানবিক চেতনার প্রকাশ পেয়েছে। এতে রাসূল সা:-এর অপরিসীম ধৈর্যের পরিচয় পাওয়া যায়। বিরল ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। কোনো ধরনের বদদোয়া না করে সর্বোচ্চ উদারতা, মহানুভবতা ও শ্রদ্ধাশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। ক্ষমতা পাওয়ার পরও প্রতিশোধ স্পৃহায় মেতে না উঠে দ্বীন কায়েমের স্বার্থে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। তায়েফের এ ঘটনা থেকে বর্তমান সময়ের ইসলামী আন্দোলনের দাঈদের জন্য উৎকৃষ্ট শিক্ষণীয় দিক রয়েছে। আল্লাহর দ্বীনের দায়িত্বকে আঞ্জাম দিতে গিয়ে বাতিলি শক্তির কাছে হেনস্তা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনাকে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে।

পরিশেষে মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে দোয়া করি, হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরক সকলকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে রাসুলের মত ধৈর্য ধারণ করার তৌফিক দান করো।এবং রাসূলের শেখানো পদ্ধতিতে "পবিত্র কুরআন" ও "সহীহ হাদীসের" দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারি, সেই তৌফিক দান করো ।আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন।
পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাদের সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ!
جزاكم الله خيرا واحسن الجزأ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন